ইয়াসমিন হত্যার ৩১ তম বাষির্কী আজ
একটি ধর্ষণ, যা নাড়িয়ে দিয়েছিলো সরকারের গদি…
গোটা দিনাজপুর কেঁপে উঠেছিল, কাঁপিয়েছিল গোটা দেশকে, এক কিশোরীর হত্যাকান্ড৷ একজনের হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিল আরও ৭ জন৷ তরুণ প্রজন্ম হয়তো জানে না, কি ছিল সেই দিনগুলো৷ তাদের জন্য :
১৯৯৫ সালের ২৩শে অগাস্ট দিবাগত রাত। ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি বাসে করে দিনাজপুরের দশমাইল মোড় এলাকায় নামে ইয়াসমিন আক্তার নামে এক কিশোরী। তার বয়স আনুমানিক ১৬ বছর। ইয়াসমিন আক্তার ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাড়িতে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করতো।
সে সময় টহল পুলিশের একটি ভ্যান সেখানে হাজির হয়। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি মেয়েটিকে পরামর্শ দেয় যে পুলিশের গাড়িতে করে দিনাজপুর শহরে যেতে।
কিন্তু পুলিশের ভ্যানে করে সেই কিশোরী দিনাজপুর শহরে যেতে রাজী ছিলেন না। তখন পুলিশ সদস্যরা বলেন যে এতো রাতে তার সেখানে একা থাকা নিরাপদ নয়।
পুলিশের সেই ভ্যানে ছিলেন একজন এএসআই এবং দুইজন কনস্টেবল।
শেষ পর্যন্ত খানিকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিশোরীটি পুলিশের ভ্যানে ওঠেন।
এরপর দিন সকালে কিশোরীটির মৃতদেহ পাওয়া পাওয়া যায় গোবিন্দপুর নামক জায়গায়।
এ খবর ছড়িয়ে গেলে ক্ষোভে-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে দিনাজপুর।
বিভিন্ন সরকারি অফিসে ভাংচুর চালিয়ে তছনছ করা হয়। দিনাজপুর শহরে কাস্টমস গুদামে মালামাল লুট করে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসেও আক্রমণ করা হয়। পরিস্থিতি এতোটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে দিনাজপুর শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিডিআর মোতায়েন করা হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দিনাজপুর শহরে কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু এই কারফিউকে আমলে নেয়নি সাধারণ মানুষ। কারফিউ উপেক্ষা করেই বিভিন্ন জায়গায় মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
একপর্যায়ে ঘটনার দুইদিন পরে এলাকাবাসী কোতোয়ালী থানা আক্রমণ করে সারারাত থানা অবরুদ্ধ করে রাখে। সে সময় কোন পুলিশ সদস্য থানা থেকে বের হতে পারেনি।
পরের দিন দিনাজপুর শহরে শতশত মানুষ বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে।
এসময় কয়েকটি জায়গায় পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভের মাত্রা এতোটাই তীব্র হয়েছিলে যে পুলিশ মিছিলকারীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে এবং তাতে ৭ জন নিহত হয়।
নিহত ইয়াসমিন আক্তারের গায়েবানা জানাজায় হাজার-হাজার মানুষ অংশ নেয়।
পুলিশের প্রতি মানুষের ক্ষোভ এতোটাই চরমে ওঠে যে পুলিশ সদস্যরা রীতিমতো লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়।
২৯শে অগাস্ট দিনাজপুর থেকে ভোরের কাগজ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনে বলা হয় – “গোটা শহরটাই যেন প্রেতপুরী। সব পুলিশ কোথায় যেন গা ঢাকা দিয়েছে। আজ শহরে একটি রিকশায় কিছু আসবাবপত্র পরিবহন করতে দেখলে এক পথচারী জানতে চায়, ‘এসব কার মাল?’ রিকশাচালক উত্তর দেয়, এগুলো পুলিশের না। শহরবাসী আর পুলিশকে বাসা ভাড়া দিবে না।”
পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এতোটাই চরমে উঠেছিল যে পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা বিডিআর পাহারার মধ্য দিয়ে দিনাজপুরে শহরে প্রবেশ করেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সামাল দিতে দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়।একই সাথে দিনাজপুর জেলা থেকে ১০৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং সদস্যকে বদলি করে অন্য জেলায় নেয়া হয়।
তবে সে সময় সরকারের তরফ থেকে একটি প্রেসনোট প্রচার করে পুলিশ সদস্যদের রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়। উল্টো ঘটনার দায় নিহত ইয়াসমিন আক্তারের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়।
সেসময়কার বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা দিনাজপুরে এসে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। প্রবল বিক্ষোভের মুখে ঘটনার পাঁচদিন পরে ময়নাতদন্ত এবং সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির জন্য ইয়াসমিনের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়।
ময়নাতদন্তের পর অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। বিচারের মাধ্যমে তারা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল।
এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের ইমেজ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ৯৬’র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের অন্যতম রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিলো।
ঘটনার নয় বছর পর অর্থাৎ ২০০৪ সালে ব তিন জন পুলিশ সদস্যকে ফাঁসি দেয়া হয়।
ধর্ষণ নিয়ে এতো বড়ো গণ আন্দোলন বাংলাদেশ এর আগে কখনো হয়নি, আজও তাই দিবসটি বিভিন্ন সংগঠন পালন করে আসছে ‘ইয়াসমিন হত্যা দিবস’ হিসেবে।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...